October 12, 2026, 3:19 pm

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন পোর্টাল
সংবাদ শিরোনাম :
ডেঙ্গু: শুধু মশার বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়, রাষ্ট্রের সক্ষমতাকেও চ্যালেঞ্জ দিচ্ছে? কুষ্টিয়া ও মেহেরপুর সীমান্তে পুশইনের দুটি চেষ্টা প্রতিহত করল বিজিবি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে পর্যটন খাতকে নতুনভাবে সাজাতে হবে: ইবি উপাচার্য ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে স্তন ক্যান্সার সচেতনতায় ‘গোলাপী সড়ক শোভাযাত্রা’ ইবির উন্নয়ন (৩য় পর্যায়)-১ম সংশোধিত প্রকল্পের বাস্তবায়ন কমিটির সভা অনুষ্ঠিত ও সাইট পরিদর্শন বলাৎকারের অভিযোগে শিক্ষক আটক করতে গিয়ে দৌলতপুরে ওসিসহ ৩ পুলিশ আহত কুষ্টিয়ায় সাবেক এমপি ও উপজেলা চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা রূপপুরের প্রথম ইউনিটে ভালভ পরীক্ষা সফল, ডিসেম্বর টার্গে ট শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বাড়ানোর আহ্বান ইবি উপাচার্যের রিকনসিলিয়েশনের আগে আওয়ামী লীগের অপরাধ স্বীকার ও অনুতাপ জরুরি

চার বছরে টোলে ৩৪২৯ কোটি টাকা/ যোগাযোগের সেতু থেকে অর্থনীতির চালিকাশক্তি পদ্মা সেতু

ড. আমানুর আমান
উদ্বোধনের চার বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই পদ্মা সেতু শুধু টোল আদায়ের নতুন রেকর্ডই গড়েনি, বদলে দিয়েছে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক বাস্তবতাও। এছাড়া উদ্বোধনের পর থেকে নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিয়মিত টোল আদায় এবং সরকারের কাছে ঋণের কিস্তি সময়মতো পরিশোধের সক্ষমতাও ধারাবাহিকভাবে বজায় রেখেছে সেতুটি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারলে, দেশের আঞ্চলিক বৈষম্য কমানো, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে এ সেতু ভুমিকা রাখবে।
সেতু বিভাগের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ২০২২ সালের ২৫ জুন উদ্বোধনের পর ২০২৬ সালের ২৯ জুন পর্যন্ত সেতুটি দিয়ে ২ কোটি ৬৮ লাখ ৬২ হাজারের বেশি যানবাহন চলাচল করেছে। এ সময়ে টোল আদায় হয়েছে ৩ হাজার ৪২৯ কোটি টাকারও বেশি। একই সঙ্গে সরকারের কাছে ঋণের ১৬টি কিস্তিতে ২ হাজার ৫১৬ কোটি টাকার বেশি পরিশোধ এবং ৪৩৬ কোটির বেশি টাকা ভ্যাট জমা দিয়েছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ।
এই পরিসংখ্যান কেবল একটি অবকাঠামোর আর্থিক সফলতার চিত্র নয়; বরং দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক রূপান্তরেরও প্রতিফলন।
একসময় পদ্মা নদী ছিল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার উন্নয়নের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক। রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগ ছিল ফেরিনির্ভর, সময়সাপেক্ষ এবং অনিশ্চিত। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেরিঘাটে অপেক্ষা, অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় এবং পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা। পদ্মা সেতু সেই চিত্র আমূল বদলে দিয়েছে। এখন যশোর, খুলনা, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, গোপালগঞ্জ, কুষ্টিয়া, মাগুরাম নড়াইল, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, বরিশাল, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী কিংবা সাতক্ষীরা থেকে রাজধানীতে পৌঁছাতে আগের তুলনায় অনেক কম সময় লাগছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য এবং সেবা খাতে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল দেশের অন্যতম বৃহৎ কৃষি উৎপাদন অঞ্চল। এ অঞ্চলে উৎপাদিত ধান, পাট, সবজি, মাছ, চিংড়ি, দুধ, ফল ও ফুল এখন দ্রুত রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। ফলে পরিবহন ব্যয় কমেছে, পণ্যের অপচয় কমেছে এবং কৃষক ও উৎপাদকরা তুলনামূলক ভালো দাম পাচ্ছেন। বিশেষ করে দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়—এমন কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণে পদ্মা সেতু নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।
শুধু কৃষিই নয়, শিল্প ও বিনিয়োগেও দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, গুদাম, কোল্ড স্টোরেজ, পরিবহন ও লজিস্টিকস সেবায় বিনিয়োগ বাড়ছে। পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, শিল্পপার্ক এবং নতুন বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগও গতি পেয়েছে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পাশাপাশি রাজধানীকেন্দ্রিক শিল্পায়নের চাপও ধীরে ধীরে কমবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
পর্যটন শিল্পেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। সুন্দরবন, কুয়াকাটা, ষাটগম্বুজ মসজিদ, টুঙ্গিপাড়া এবং দক্ষিণাঞ্চলের অন্যান্য পর্যটনকেন্দ্রে এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি পর্যটক যাতায়াত করছেন। যোগাযোগ সহজ হওয়ায় হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হয়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করছে।
বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও পদ্মা সেতুর গুরুত্ব বাড়ছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্প ও কৃষিপণ্য দ্রুত রাজধানী এবং সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বেড়েছে। ভবিষ্যতে মোংলা বন্দর, পদ্মা রেল সংযোগ এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হলে এই অঞ্চলের উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পাবে। ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল দেশের অন্যতম শিল্প ও বাণিজ্যিক করিডরে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে প্রায় ৩০ হাজার ৭৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পদ্মা সেতু আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের সক্ষমতার প্রতীক। সরকারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী ৩৫ বছরে ঋণ পরিশোধের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও ইতোমধ্যে নির্ধারিত সব কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করা হয়েছে। এটি রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে বাস্তবায়িত বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের আর্থিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পদ্মা সেতুর প্রকৃত অর্থনৈতিক সুফল এখনও পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। সেতুকেন্দ্রিক শিল্পায়ন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, আধুনিক লজিস্টিকস ব্যবস্থা, কোল্ড চেইন, রেল সংযোগ এবং মোংলা বন্দরের সক্ষমতা আরও বাড়ানো গেলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে কৃষিভিত্তিক শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, মৎস্য ও চিংড়ি রপ্তানি এবং পর্যটন খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
চার বছরে ৩ হাজার ৪২৯ কোটি টাকার টোল আদায়ের হিসাব তাই শুধু রাজস্বের একটি সংখ্যা নয়। এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা কাটিয়ে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রতীক। পদ্মা সেতু ইতোমধ্যেই এ অঞ্চলের জীবনযাত্রা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ধারা বদলে দিয়েছে। আগামী বছরগুলোতে সেতুকে ঘিরে পরিকল্পিত শিল্পায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়ন বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিনে পরিণত হবে—এমন প্রত্যাশাই এখন সবচেয়ে জোরালো।
+++++++++++
ড. আমানুর আমান, সম্পাদক, প্রকাশক, দৈনিক কুষ্টিয়া ও দি কুষ্টিয়া টাইমস

নিউজটি শেয়ার করুন..

Comments are closed.

পুরোনো খবর এখানে,তারিখ অনুযায়ী

© All rights reserved © 2024 dainikkushtia.net
Maintenance By DainikKushtia.net